স্কুলে ভর্তি হতেই গাছের ও নিজের নামে পৌঁছে যায় নেমপ্লেট, গাছ বাঁচানোর অভিনব প্রচেষ্টা বীরভূমে

রণদীপ মিত্র : ভর্তি হওয়ার সাথে সাথেই হাতে পৌঁছে যায় একটি নেমপ্লেট। তাতে লেখা একটি গাছের নাম ও ভর্তি হওয়ার পড়ুয়ার নাম। অর্থাৎ ভর্তির দিন থেকেই স্কুলে থাকা সেই গাছের দায়িত্ব পড়ে যায় ওই পড়ুয়ার মাথায়। সেই গাছই হয়ে ওঠে পড়ুয়ার আপনজন। সেবা-যত্ন, জল দেওয়া, সার দেওয়া, পোকা-মাকরের হাত থেকে রক্ষা করা সব কিছু প্রতিদিন নিজে হাতে করেন কচি-কাঁচারা। মহা আনন্দে। এমনই এক অভিনব উদ্যোগের সাক্ষী বোলপুরের আদিবাসী পাড়া। উদ্যোক্তা এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। চমকে উঠতে হয় দেখে-শুনে। গত প্রায় পনেরো বছর ধরে এই রুটিনেই এগিয়েই চলেছে বিদ্যালয়ের পরিবেশ বান্ধব শিক্ষন। স্কুলের চৌহদ্দি এই করে আজ ৭০-৮০ মহিরূহে ঠাসা। তার পাশে আরো বহু চারাগাছ অপেক্ষামান ছোট ছোট কচি-কাঁচাদের হাত ধরে মহিরূহে পরিণত হওয়ার।

বিদ্যালয়ের নাম বল্লভপুর ডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়। বোলপুরের খোয়াইয়ের ঠিক পেছনেই বল্লভপুরডাঙ্গা আদিবাসী পাড়ার সম্পদ এই গাছ-স্কুল। ২০০৫ সালে পথ চলা শুরু করে আদিবাসী অধ্যুষিত এক গরিব জনপদের এই স্কুলটি।

কীভাবে চলে এই উদ্যোগ?

প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হলেই পড়ুয়ার হাতে তুলে দেওয়া হয় গাছের নাম ও পড়ুয়ার নাম লেখা একটি নেমপ্লেট। ভর্তির হওয়ার পরের দিন থেকেই গাছটির সমস্ত দায়িত্ব ওই পড়ুয়ার। যেমন তৃতীয় শ্রেণির দীপঙ্কর টুডুর ভাগে পড়েছে একটি দেবদারু গাছ। গত দুবছর সে ও তার দেবদারু একাত্ব হয়ে রয়েছে। সকালে এসেই দীপঙ্করের কাজ নেমপ্লেটটি সূতো দিয়ে গাছে ঝোলানো। পেরেকের ব্যবহার একেবারেই নিষিদ্ধ। তারপর গাছে জল দেওয়া। আগাছা পরিস্কার করা, সার দেওয়া, পোকা-মাকরের সংক্রমন হল কি না সবকিছুই নজরদারি করতে হয় ওই ছাত্রকেই। স্কুল চত্বরেই রয়েছে দুটি ভ্যাট। একটির নাম , ‘আমি পচি’ অপরটির নাম ‘আমি পচি না’। অর্থাৎ গাছের আশপাশে জড়ো হওয়া আবর্জনা যা থেকে সার করা যায় তার ঠাঁই হয় একটি ভ্যাটে। আর যেগুলি পরিবেশের শত্রু যেমন প্লাস্টিক ইত্যাদির ঠাঁই হয় অপরটিতে। এইভাবেই একটি ছাত্র ‘মানুষ’ করেন গাছকে। গাছের সাথে একাত্ব হয়ে। পড়ুয়াদের উৎসাহিত করতে হয় গাছ পরিচর্যার মূল্যায়নও।

এক শিক্ষক জানালেন, ‘‘শুধু তাই-ই নয়। হয় ফল বিতরনও। যেমন পেয়ার গাছে কুড়িটি পেয়ারা ধরলে তাকে সমান ভাগে টুকরো করে প্রার্থনার সময় শিক্ষক-পড়ুয়াদের মধ্যে বিলি করা হয়। সবাই মিলে বেজায় আনন্দে সেই পেয়ারা খাই।’’

শৈবালিনি মার্ডি। ক্লাস থ্রি-তে পড়ে। তার দায়িত্বে রয়েছে একটি পেয়ারা গাছ। তার কথায়, ‘‘যতদিন এই স্কুলে পড়ব ততদিন এই গাছের সেবা আমিই করব। ফল হবে। সবাই মিলে খাব। বাড়ি থেকে গোবর সার আনি। এছাড়াও আমাদের স্কুলে ভ্যাটে যে আবর্জনা জমা হয় তা থেকেও সার করে গাছে দিই। প্রতিদিন জল দিই। লক্ষ্য রাখি পোকা-মাকর বা অন্যকিছু যেন গাছের কোনো ক্ষতি না করে।’’

এক অসাধারন পরিবেশ স্কুলজুড়ে। স্কুলের আরো অভিনব বৈশিষ্ঠ্য হল, এখানে নেই কোনো ক্লাস রুম। একটি কক্ষ রয়েছে শুধু শিক্ষকদের জন্য। তার চারপাশ থেকে ডানার মত বেরিয়েছে ছ’টি বারান্দা। সেখানেই আদিবাসী পাড়ায় তৈরী চাটাই পেতে হয় ক্লাস।

বকুল, আম, জাম, মসুন্ডা, ক্রিসমাস, কাঁঠাল, সেগুন কি নেই স্কুলে। প্রতিটির মালিক এক-একজন পড়ুয়া। প্রথম শ্রেনিতে ভর্তি হওয়ার পর চার বছর ধরে গাছের পরিচর্যা করে কোনো পড়ুয়া যখন চতুর্থ শ্রেণি উত্তীর্ণ হয়ে স্কুল ত্যাগ করে তখন আবার প্রথম শ্রেনিতে ভর্তি হওয়া নতুন এক পড়ুয়ার উপর বর্তায় গাছটির দায়িত্ব। এছাড়াও বর্ষার সময় হয় নতুন চারাগাছ রোপনের কাজ। তবে এই কাজ করতে গিয়ে জলের আকাল বেজায় ভোগাচ্ছে স্কুল। গোটা স্কুলে একটি মাত্র হ্যান্ডপাম্প। তার উপরই ভরসা করতে হয় এত এত গাছ পরিচর্যা করার জন্য। সঙ্গে আছে মিড-ডে মিলের জন্য জলের চাহিদা। স্কুলে বর্তমানে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে রয়েছেন চারজন শিক্ষক-শিক্ষিকা।

প্রধান শিক্ষক ভগবান মিশ্র বলেন, ‘‘২০০৫ সাল থেকেই এই একটি গাছের জন্য একজন পড়ুয়ার উদ্যোগ চলছে। চেষ্টা করছি এই উদ্যোগকে আরো প্রসারিত করা। তবে জলের সমস্যা যদি মেটানো যায় তাহলে উদ্যোগ আরো গতি পাবে।’’

স্কুল চাইছে, বোরিং করে পাইপ লাইন মারফত জল সরবারহরের একটা বন্দোবস্ত হোক। বিদ্যুৎ, সুকুরমনিরা নিক একের জায়গায় দুটি করে গাছের দায়িত্ব। বাঁচুক পরিবেশ। শিক্ষা হোক পরিবেশ বান্ধব।