স্কুলে পড়ার জন্য সপ্তাহে শুধুমাত্র ২৫টি প্লাস্টিক দ্রব্য ; এটাই এই স্কুলের ফিজ!

নিজস্ব প্রতিবেদন : স্কুলে পড়াশোনা করার খরচ বলতে একটাই তাহলো বর্জিত প্লাস্টিক দ্রব্য। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্য, এমনই এক অভিনব স্কুল রয়েছে আমাদের ভারতবর্ষে। এখানে পড়াশোনা করতে গেলে আলাদা করে কোন রকম খরচ লাগে না। অবশ্য ভারতবর্ষে অজস্র অবৈতনিক স্কুল রয়েছে কিন্তু তাদের মধ্যেও এই স্কুলটি অভিনব। কারণ একটাই, স্কুল অবৈতনিক হলেও স্কুলে পড়াশোনা পড়ার জন্য পড়ুয়াদের সপ্তাহে অন্তত পক্ষে ২৫ টি প্লাস্টিক দ্রব্য জমা দিতে হয়।

অভিনব এই স্কুলটি হল ভারতবর্ষের আসাম রাজ্যে। স্কুলের নাম ‘অক্ষর’। সকালে ক্লাস শুরু হওয়ার সাথে সাথেই স্কুলের সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়ায় ছাত্রছাত্রীরা। পড়ুয়াদের পিঠে থাকে স্কুল ব্যাগ আর হাতে পলিথিন ব্যাগ। স্কুলের প্রকৃতিও আর পাঁচটা স্কুলের থেকে আলাদা। বাঁশের ছাদের নিচে খোলামেলা পরিবেশে ক্লাস করেন পড়ুয়ারা। এই স্কুলে বয়স ভিত্তিক কোনরকম ক্লাস বিভাজনের ব্যবস্থাও নেই।

সকলের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে স্কুলে পড়াশোনার জন্য কোন বেতন লাগে না, অথচ কেন ‘ফিজ’ নেওয়া হয় সপ্তাহে অন্তত ২৫ টি প্লাস্টিক দ্রব্য!

এই অভিনব স্কুলের পরিকল্পনা দুইজনের মস্তিষ্কপ্রসূত। যাদের পরিকল্পনাতেই লুকিয়ে রয়েছে স্কুলের গঠন থেকে পড়ুয়াদের ও প্রকৃতির ভবিষ্যৎ। পারমিতা শর্মা এবং মাজিন মুখতার এমন স্কুলের পরিকল্পনা করেন। হঠাৎ করে এমন স্কুলের পরিকল্পনা কেন?

২০১৩ সালে মাজিন নিউইয়র্ক থেকে ভারতে আসেন একটি অন্য স্কুলের প্রজেক্ট নিয়ে। সে সময়ই তার সঙ্গে পরিচিয় হয় পারমিতার। পারমিতা সেসময় টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সে সামাজিক কাজ নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করছেন। তারপর দুজনের মধ্যেই ইচ্ছা হয় শিক্ষা ক্ষেত্রে কোন কাজ করার।

তারপর দুজনে মিলে আসামের পামোহিতে ‘অক্ষর’ নামের স্কুলের স্বপ্ন দেখলেন। অদম্য ইচ্ছা থেকে দ্রুত সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করেও ফেললেন। তারপর আর ইনাদের পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। শুধুই উত্তরণের গল্প।

আসামের ওই এলাকায় বেশিরভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এমন একটা স্কুলের পরিকাঠামো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের হলেও প্রয়োজনটা ছিল তার থেকেও বেশি জরুরি। কারণ এলাকার শিশুরা স্কুলের পথে পা না বাড়িয়ে ছুটে যায় নিকটবর্তী খাদানে কাজ করতে। আর এই স্কুল অক্ষরের সফলতা এখানেই। এলাকার ছোট ছোট শিশুরা অবশেষে দেখছে শিক্ষার আলো।

এইভাবে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের সামনে পড়াশুনোকে তুলে ধরা কাজটা সহজ ছিল না তা সকলেরই অনুমেয়। কারণ তাদের কাছে পড়াশুনোর থেকে পেটের ভাতটা আগে। এই এলাকায় স্কুল চালানোর জন্য জন্য নেওয়া যাবে না কোনো পড়াশোনার খরচ, সেই সঙ্গে দুজনকে ভাবাচ্ছিল এলাকার দূষণ। এলাকার বাসিন্দাদের অধিকাংশই শীতের হাত থেকে বাঁচতে প্লাস্টিকের বর্জ্য পদার্থ পুড়িয়ে উষ্ণতার খোঁজ করে। এরফলে পরিবেশও ভীষন দূষিত হতে থাকে। তাই তারা দুজনে ঠিক করে স্কুলে পড়াশুনার ফিজ হিসাবে প্লাস্টিকের বর্জ্য জোগাড় করার পরিকল্পনা। আর তাতেই মিলেছে সাফল্য। আর পড়াশোনার সাথে সাথেই সেই সকল বর্জ্যপদার্থ থেকে প্রয়োজনীয় নানান সামগ্রীও বানাতে শিখেছি পড়ুয়ারা।

নিকটবর্তী খাদানে কাজ করে দেড়শ থেকে দুইশ টাকা পারিশ্রমিক পাওয়া যায় দৈনিক হিসাবে। তার সঙ্গে পাল্লা দিতে শুরু হয় স্কুলের পুরাতন পড়ুয়ারা নতুনদের প্লাস্টিক দ্রব্য থেকে নানান জিনিস তৈরি করা শেখাবে। তার বিনিময় তারা পাবে খেলনা টাকার নোট। সেই খেলনা টাকার নোট দিয়ে পার্শ্ববর্তী দোকান থেকে পাওয়া যাবে জামাকাপড়, খেলনা, জুতো, তেলেভাজা ইত্যাদি। শুধু তাই নয় পড়ুয়ারা যদি সেই খেলনা টাকা দিয়ে স্কুল থেকে সত্যিকারের টাকাও নিতে পারে। এছাড়াও ওই খেলনা টাকা দিয়ে অ্যামাজন থেকে সমমূল্যের জিনিস কেনাকাটা করতে পারে।

স্কুল শুরু হয়েছিল মাত্র কুড়িটি বাচ্চাকে নিয়ে, যা বর্তমানে সংখ্যা ছাড়িয়েছে একশোর বেশি। চার থেকে ১৫ বিভিন্ন বয়সের পড়ুয়ারা নিয়মিত স্কুলে আসে পড়াশোনা করতে। দুই তরুণ-তরুণীর দেখা স্বপ্ন ধীরে ধীরে ডানা মেলেছে। ধীরে ধীরে ওই দারিদ্র এলাকায় শিক্ষার আলো দেখছে ছোট ছোট শিশুরা। আর এভাবেই চলতে থাকলে আগামী প্রজন্মও একইভাবে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে। পারমিতা ও মাজিন দুজনেই বদ্ধপরিকর শিক্ষার আলোকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে।