কে জগন্নাথদেবের মাসি, কেন জগন্নাথদেবের মূর্তি অর্ধনির্মিত, কি রয়েছে পৌরাণিক কাহিনী

নিজস্ব প্রতিবেদন : সনাতন ধর্ম মতে এবং হিন্দুশাস্ত্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে আয়োজিত হয় রথযাত্রা। রথযাত্রার ভারত তথা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হয়ে থাকলেও ওড়িশার পুরীর রথযাত্রা সকলের নজর কাড়ে। কপিলা সংহিতা, ব্রহ্ম পুরাণ, পদ্ম পুরাণ ও স্কন্দ পুরাণে পুরীর এই রথ যাত্রার বর্ণনা এবং রথযাত্রা সংক্রান্ত একাধিক বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে।

জগন্নাথ দেবকে ঘিরে যে সকল উৎসব রয়েছে তার মধ্যে মূল উৎসবই হল এই রথযাত্রা। রথযাত্রার দিন জগন্নাথ দেব, বলরাম দেব এবং সুভদ্রা দেবী রথে চেপে মাসির বাড়ি যান। কিন্তু প্রশ্ন হল জগন্নাথদেবের মাসি কে? জগন্নাথ দেবের মাসি হলেন ইন্দ্রদ্যুম্নের পত্নী গুন্ডিচার। তার বাড়িতেই যান তিনি। সেখান থেকে আবার সাতদিন পর প্রত্যাবর্তন করেন।

রথযাত্রারকে কেন্দ্র করে ওড়িশার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গেও মহাসমারোহ লক্ষ্য করা যায়। তবে মনে করা হয় ওড়িশা থেকেই এই রথযাত্রার শুরু পশ্চিমবঙ্গে। মহাপ্রভু চৈতন্যদেব নিলাচল থেকে এই ধারাটি এখানে নিয়ে এসেছিলেন।

জগন্নাথদেবের মূর্তি ও মন্দির গড়ে ওঠার পিছনে থাকা পৌরাণিক কাহিনী

জগন্নাথ দেবের পুরীর মন্দির গড়ে ওঠার পিছনে যেসকল পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে তাদের পদ্মপুরাণ অনুযায়ী, মালবরাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন ছিলেন বিষ্ণুর পরম ভক্ত। তিনি এই মন্দির তৈরি করিয়েছিলেন এবং নাম রাখা হয়েছিল শ্রীক্ষেত্র। যা পরে জগন্নাথ ধাম নামে পরিচিত হয়।

মালবরাজ ইন্দ্রদ্যুম্নর তৈরি শ্রীক্ষেত্র মন্দিরে কোন বিদ্রোহ ছিল না। একদিন রাজসভায় কেউ একজন নীলমাধবের কথা তোলেন। নীলমাধব নাকি বিষ্ণুর অপর রূপ ছিলেন। কিন্তু তাকে কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে তা কারও জানা ছিল না। যে কারণে মহারাজা নীলমাধবকে খোঁজার জন্য লোক পাঠালেন। কিন্তু দেখা গেল কেউ তাকে খুঁজে না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরলেন। কিন্তু এই ফিরে আসাদের মধ্যে একজন আসতে পারেননি। যিনি হলেন বিদ্যাপতি। জঙ্গলে রাস্তা হারান তিনি।

পথ হারানো বিদ্যাপতিকে উদ্ধার করেন শবররাজ বিশ্ববসুর কন্যা ললিতা। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে ভাব হয় এবং প্রেম, আর তা থেকেই জঙ্গলে তাদের শুরু হয় দাম্পত্য জীবন। অন্যদিকে এর মাঝে বিদ্যাপতি লক্ষ্য করেন তার শ্বশুর মশাই অর্থাৎ শবররাজ বিশ্ববসু প্রতিদিন স্নান সেরে কোথাও যান। এই যাওয়াকে কেন্দ্র করে কৌতুহল তৈরি হয় বিদ্যাপতির মধ্যে। তারপর বিদ্যাপতি ললিতাকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন, জঙ্গলের গহীনে নীল পর্বতে নীলমাধবের মূর্তি রয়েছে। সেখানেই প্রতিদিন পুজো দিতে যান বিশ্ববসু।

বিদ্যাপতি যার খোঁজে বেরিয়ে ছিলেন তার কথা জানতে পেয়ে আনন্দে আটখানা হয়ে যান। তার হারিয়ে যাওয়া সার্থক বলেই তিনি মনে করেন। এরপর তিনি নীলমাধবের দর্শন করতে শ্বশুর মশাইকে অনুরোধ করেন। ভক্তিভরে নীলমাধবের পুজোর শুরু করার পাশাপাশি মহারাজা ইন্দ্রদুম্ন্যের কাছে খবর পাঠানো হয় এই নীলমাধবের খোঁজ পাওয়া নিয়ে। খবর পেয়ে তড়িঘড়ি মহারাজা জঙ্গলে গেলেন। কিন্তু জঙ্গলে গিয়ে আবার খোঁজ পাওয়া গেল না নীলমাধবের। তবে খোঁজ না পাওয়া গেলেও জঙ্গলের মাঝে দৈববাণী শোনা যায়, ‘সমুদ্রের জলে ভেসে আসবে যে কাঠ সেই কাষ্ঠখণ্ড থেকেই তৈরি হবে বিগ্রহ (নীলমাধব)’।

এরপর একদিন হঠাৎ সবাইকে অবাক করে সমুদ্রে ভেসে এলো কাঠ। কিন্তু সেই কাঠ এত শক্ত ছিল যে তাতে হাতুড়ি বসানো তো দূরের কথা বরং হাতুড়ির অবস্থায় যায় যায়। আর এই ঘটনার পরে কাঠ পেলেও এত শক্ত কাঠে কে মূর্তি তৈরি করবে এই কাঠে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন রাজা। রাজার এই পরিস্থিতি দেখে এবার স্বয়ং ভগবান দুঃখ পেয়ে জগন্নাথ শিল্পীর রূপ নিয়ে রাজপ্রাসাদের দরজায় হাজির হলেন। সেখানে তিনি এসে জানালেন তিনি বিগ্রহ তৈরি করে দেবেন। তবে একটি শর্ত আছে।

শর্ত হিসাবে বলা হয় বিগ্রহ তৈরি করার জন্য ২১ দিন অর্থাৎ তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে কেউ তার কাষ্ঠমূর্তি নির্মাণ দেখতে পাবেন না। আর এই শর্ত মেনেই মহারাজা দারুশিল্পীকে মূর্তি নির্মাণের অনুমতি দিলেন। মূর্তি নির্মাণ শুরু হলো। তবে কয়েকদিন মূর্তি নির্মাণের পর আর ধৈর্য ধরল না ইন্দ্রদ্যুম্নের রানী গুণ্ডিচার।

একদিন মূর্তি নির্মাণের ঘর থেকে কোনও আওয়াজ না পেয়ে তিনি হঠাৎ দরজা খুলে ঢুকে পড়লেন। আর দরজা খুলে ঢুকে দেখেন কারিগর উধাও। রয়েছে তিনটি অর্ধ সমাপ্ত মূর্তি। তবে এই মুহূর্তে রীতিমতো ভিমরি খাইয়ে দেয় ইন্দ্রদ্যুম্নের রানী গুণ্ডিচাকে। গোল গোল চোখ, গাত্র বর্ণসহ অসমাপ্ত মূর্তির না আছে হাত, না আছে পা। আর এই ঘটনার পর অনুশোচনায় পড়েন রাজা ও রানী। শর্ত লঙ্ঘন করার কারণেই এমন ঘটনা বলে তারা এই অনুশোচনা করেন। তবে এই অনুসূচনা পর্ব দীর্ঘায়িত হতে দেননি ভগবান। স্বপ্নে স্বয়ং জগন্নাথ এসে জানান, ‘এমনটা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল৷ আমি এই রূপেই পূজিত হতে চাই’।