দীর্ঘ দিনের বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে লোকসভায় পাশ হয়ে গেল ওয়াকফ সংশোধনী বিল। শাসক দলই শেষমেশ জয়ের হাসি হাসলো। বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন ২৮৮ জন সাংসদ এবং বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন মোট ২৩২ জন। তবে একটা প্রশ্নের উত্তর এখনো অনেকেই জানেন না। তা হল কেন এই বিলটি নিয়ে এতো বিতর্ক? তৃণমূল, কংগ্রেসের মতো রাজনৈতিক দল কেনই বা এই বিলের বিরুদ্ধে বাঁধ সাধছেন? এই প্রতিবেদনে রইলো সব উত্তর।
প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক এই ওয়াকফ আসলে কী? নানান ধর্মীয় কাজকর্মে ও মুসলিম সম্প্রদায়ের উন্নতির কাজে মুসলিমরা তাদের সম্পত্তির যে অংশটুকু দান করেন তাই একে বাক্যে ওয়াকফ নামে পরিচিত। তবে তাদের দান করা এই ওয়াকফ সম্পত্তি কোনোভাবেই কাউকে বিক্রি করা কিংবা ব্যবসার কাজে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন বিশ্বাস করেন, ওয়াকফ তাদের নয়, বরং স্বয়ং ঈশ্বরের সম্পত্তি।
আরও পড়ুন: PF UPI: প্রভিডেন্ট ফান্ডে জুড়ছে ইউপিআই! বেসরকারি কর্মীদের এবার বিরাট স্বস্তি
এরপর যে বিষয়টি জানার ওপর জোর দিতে হবে তা হল ওয়াকফ বোর্ড। কী এই ওয়াকফ বোর্ড? খুব সহজ কথায় বললে, মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন তাদের সম্পত্তির যে অংশ টুকু দান করেন, সেই সম্পত্তির আয় থেকে মসজিদের খরচ চালানো, শিক্ষার কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি অনাথ শিশুদের ভালো রাখতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কাজ হতে পারে। আর এইসব সম্পত্তি সঠিকভাবে পরিচালনা করার দায়িত্বে রয়েছে ওয়াকফ বোর্ড। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে গোটা ভারতে ওয়াকফ বোর্ডের সম্পত্তির পরিমাণ ৮.৭ লক্ষেরও বেশি। সাধারণত, দেশে রেল এবং ভারতীয় সেনার পর সবচেয়ে বেশি সম্পত্তির নিরিখে নাম রয়েছে ওয়াকফ বোর্ডেরই।
বর্তমান ওয়াকফ বিলের ৪০ নম্বর ধারা আইনে উল্লেখিত রয়েছে, ওয়াকফ বোর্ডের যে সম্পত্তি বা জমি দখল করে তাতে সরকারের তরফে কোনওরকম পর্যালোচনা করার নিয়ম নেই। সরকারি পর্যালোচনা না করেই ওয়াকফ বোর্ডের জমি দখলের সুযোগ রয়েছে। উপরন্তু কোনও সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা এবং ওয়াকফ বোর্ডের আইনি বিবাদ চললে তাতেও চুপ থাকতে হবে সরকারকে। এই সংশোধনী বিলের মাধ্যমে সরকার এই আইনেই ওয়াকফ অধিকার শেষ করতে চাইছে। কোনও সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ বা বিতর্ক চললে সেই জমির মালিকানা আসলে কার সেই জট কাটাতে তা খতিয়ে দেখার আইনি এক্তিয়ার সরকার নিজের হাতে শক্ত করে রাখতে চাইছে।
নতুন সংশোধনীতে ওয়াকফ বোর্ডের সেই একচ্ছত্র অধিকার কেড়ে নিয়ে কোনও সম্পত্তি আদেও ওয়াকফ কি না তা যাচাই করতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হবে জেলাশাসক বা সমপদমর্যাদার কোনও আধিকারিকের হাতে। একইসাথে দুই অমুসলিম সদস্যের অন্তর্ভুক্তির বন্দোবস্ত নিয়েও আপত্তি উঠেছে নতুন বিলে। তা বাদেও রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় পোর্টালের মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তির নথিভুক্তিকরণ নিয়ন্ত্রণ করার প্রস্তাব। পূর্বের আইন মতে কোনও সম্পত্তিকে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করলে, সারাজীবনের জন্য সেটি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসাবেই থেকে যেত। নতুন বিলে এবার সেটাকেও কাঠগড়ায় তোলা যাবে।
এবার জেনে নেওয়া যাক ওয়াকফ সংশোধনীর আসল কারণ কী?
শাসক দলের যুক্তি অনুযায়ী বর্তমানে যে আইন রয়েছে, তাতে ওয়াকফ যেসব জমি বা সম্পত্তি দখল করে তা কোনও ভাবেই পর্যালোচনা করা সম্ভব হয় না। কারোর আপত্তির তোয়াক্কা না করেই জমি বা সম্পত্তি অনায়াসে নিজেদের দখলে টেনে নেয় ওয়াকফ বোর্ড। বিজেপি মনে করে, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ওয়াকফ সম্পত্তির যাবতীয় সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে। তাতে তালিকায় নেই সাধারণ মুসলিমদের নাম। নতুন আইন কার্যকর হলে সাধারণ মুসলিমরা সমানভাবে সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
সবশেষে যে প্রশ্নের উত্তর রইলো তা হল এই নতুন বিল থেকে কেন মুখ ফিরিয়ে রেখেছে তৃণমূল ও কংগ্রেস দলগুলি?
বিরোধীদের মতামত অনুযায়ী এই বিল ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের স্বত্ত্বায় আঘাত আনে। বিশেষত ওয়াকফ বোর্ডে অমুসলিমদের থাকা নিয়ে তীব্র আপত্তি রয়েছে বিরোধী শিবিরের। একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে টার্গেট করার জন্য এই বিল আনা হচ্ছে বলে দাবি তাদের।