পশ্চিমবঙ্গ সরকারের Yuvasathi Scheme বা যুবসাথী প্রকল্পটি রাজ্যের শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা কর্মসূচি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে যুবকরা কর্মসংস্থানের খোঁজে বা উচ্চশিক্ষায় অগ্রসর হওয়ার সময় আর্থিক সুরক্ষা পান। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ২০২৬ সালের বাজেটে ঘোষিত এই Yuvasathi প্রকল্পটি লক্ষ লক্ষ যুবকের জীবনকে সহজ করে তুলেছে। এই নিবন্ধে আমরা প্রকল্পের সব দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যাতে আপনি সহজেই বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনে আবেদন করতে পারেন।
যুবসাথী প্রকল্প কী? | Yuvasathi 2026
Yuvasathi Scheme হলো পশ্চিমবঙ্গের যুব কল্যাণ ও ক্রীড়া দপ্তরের অধীনে একটি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। এটি মূলত শিক্ষিত কিন্তু কর্মহীন যুবক-যুবতীদের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে তারা চাকরির সন্ধান বা দক্ষতা বিকাশের সময় আর্থিক চাপ থেকে মুক্ত থাকতে পারেন। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত হয়েছে এবং ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো যুবকদের স্বনির্ভরতা বাড়ানো এবং রাজ্যের বেকারত্বের সমস্যা মোকাবিলা করা। এই প্রকল্পটি পশ্চিমবঙ্গের সকল জেলায় প্রযোজ্য এবং এর মাধ্যমে সরকারি সহায়তা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যায়।
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| প্রকল্পের নাম | বাংলার যুবসাথী / Banglar Yuva Sathi Scheme / যুবসাথী প্রকল্প |
| ঘোষণা | ২০২৬ সালের অন্তর্বর্তী বাজেটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক ঘোষিত |
| আর্থিক সাহায্য শুরুর তারিখ | ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে (আবেদন শুরু ফেব্রুয়ারি ২০২৬) |
| মাসিক সাহায্যের পরিমাণ | ১,৫০০ টাকা (বার্ষিক ১৮,০০০ টাকা) |
| সাহায্যের সর্বোচ্চ মেয়াদ | ৫ বছর বা চাকরি/স্বনির্ভর হওয়া পর্যন্ত |
| পেমেন্ট পদ্ধতি | ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT) – আধার লিঙ্কযুক্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে |
| যোগ্যতা – বয়স | ২১ থেকে ৪০ বছর |
| যোগ্যতা – শিক্ষাগত | ন্যূনতম মাধ্যমিক (ক্লাস ১০) বা সমতুল্য উত্তীর্ণ |
| অন্যান্য যোগ্যতা | পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা, বর্তমানে বেকার, অন্যান্য সরকারি ভাতা প্রকল্পের (যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার) সুবিধা না নেওয়া (কিছু স্কলারশিপ বাদে) |
| আবেদনের তারিখ (ক্যাম্প) | ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ |
| আবেদন পদ্ধতি | অনলাইন (apas.wb.gov.in) এবং অফলাইন (দুয়ার সরকার ক্যাম্প / বিধানসভা কেন্দ্র) |
| প্রধান প্রয়োজনীয় নথি | আধার কার্ড, মাধ্যমিক সার্টিফিকেট/অ্যাডমিট কার্ড, আধার লিঙ্কযুক্ত ব্যাঙ্ক পাসবুক, ছবি, মোবাইল নম্বর |
| প্রকল্পের দপ্তর | যুব কল্যাণ ও ক্রীড়া দপ্তর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার |
| বাজেট বরাদ্দ | প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা |
যুবসাথী প্রকল্পের উদ্দেশ্য
যুবসাথী প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো রাজ্যের যুবশক্তিকে আর্থিকভাবে সাহায্য করা, যাতে তারা উচ্চশিক্ষা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বা কর্মসংস্থানের দিকে মনোনিবেশ করতে পারেন। এটি বেকারত্বের কারণে যুবকদের মানসিক চাপ কমায় এবং তাদের স্বাধীনতা দেয়। সরকারের লক্ষ্য হলো যুবকদের দক্ষতা বিকাশে উৎসাহিত করা, যাতে তারা ভবিষ্যতে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারেন। এছাড়া, এই প্রকল্পটি রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যুবকদের অবদান বাড়াতে সাহায্য করে। প্রকল্পটি বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার যুবকদের জন্য উপকারী, যেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম।
যুবসাথী প্রকল্পের যোগ্যতা মানদণ্ড
Yuvasathi Scheme-এ আবেদন করতে হলে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রথমত, আবেদনকারীকে পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। বয়সসীমা ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে ন্যূনতম মাধ্যমিক (ক্লাস ১০) বা সমতুল্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া দরকার। আবেদনকারীকে অবশ্যই কর্মহীন বা বেকার হতে হবে এবং অন্য কোনো সরকারি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের (যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার) লাভ না নেওয়া উচিত। তবে কিছু স্কলারশিপ যেমন স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট-কাম-মিনস স্কলারশিপের সাথে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। পুরুষ এবং মহিলা উভয়েই আবেদন করতে পারেন, এবং এটি সকল জাতি-ধর্মের জন্য উন্মুক্ত।
যুবসাথী প্রকল্পের সুবিধা
যুবসাথী প্রকল্পের মূল সুবিধা হলো প্রতি মাসে ১৫০০ টাকা আর্থিক সাহায্য, যা বার্ষিক ১৮,০০০ টাকা হয়। এই টাকা সরাসরি আধার-লিঙ্কযুক্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT) পদ্ধতিতে পাঠানো হয়। সুবিধা সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত বা কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত চলতে পারে। এটি যুবকদের চাকরির প্রস্তুতিতে সাহায্য করে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রদান করে। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে, যা আগের ঘোষিত তারিখ ১৫ আগস্ট থেকে এগিয়ে আনা হয়েছে। সরকার এর জন্য ৫,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে এবং আনুমানিক ২৭.৮ লক্ষ যুবক এর লাভ পাবেন।
যুবসাথী প্রকল্পে আবেদন প্রক্রিয়া | Yuvasathi Online Apply
Yuvasathi-তে আবেদন করা খুব সহজ। আবেদন ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। অনলাইন এবং অফলাইন উভয় পদ্ধতিতে আবেদন সম্ভব, এবং এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
- অনলাইন আবেদন: অফিসিয়াল ওয়েবসাইট apas.wb.gov.in-এ যান। ‘নিউ রেজিস্ট্রেশন’ অপশনে ক্লিক করে ব্যক্তিগত তথ্য, শিক্ষা বিবরণ এবং ডকুমেন্ট আপলোড করুন। আবেদন জমা দেওয়ার পর অ্যাপ্লিকেশন নম্বর পাবেন, যা স্ট্যাটাস চেক করার জন্য ব্যবহার করুন। অনলাইন প্রক্রিয়া রাত ১২টা থেকে শুরু হয়েছে।
- অফলাইন আবেদন: নিকটবর্তী দুয়ার সরকার ক্যাম্প, বিডিও বা এসডিও অফিসে যান। ফর্ম ডাউনলোড করে পূরণ করুন এবং ডকুমেন্ট সহ জমা দিন। প্রত্যেক বিধানসভা কেন্দ্রে বিশেষ ক্যাম্প চালু রয়েছে।
আবেদনের পর যাচাই-বাছাই হয়, এবং যোগ্য হলে টাকা পাওয়া শুরু হয়। প্রথম দিনেই লক্ষাধিক আবেদন পড়েছে, যা প্রকল্পের জনপ্রিয়তা দেখায়।
যুবসাথী প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র
আবেদনের সময় নিম্নলিখিত ডকুমেন্ট দরকার:
- আধার কার্ড (পরিচয় এবং ঠিকানার প্রমাণ, মোবাইল লিঙ্কযুক্ত)।
- মাধ্যমিক অ্যাডমিট কার্ড বা জন্ম প্রমাণপত্র (বয়স প্রমাণ)।
- মাধ্যমিক মার্কশিট বা সার্টিফিকেট (শিক্ষাগত যোগ্যতা)।
- আধার-লিঙ্কযুক্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণ (পাসবুকের কপি)।
- সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
- মোবাইল নম্বর (ওটিপি এবং আপডেটের জন্য)।
ডকুমেন্টগুলো ডিজিটাল ফরম্যাটে রাখুন এবং অফলাইনের ক্ষেত্রে জেরক্স কপি নেবেন। নাম, তারিখ এবং অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে মিলিয়ে নিন, না হলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
যুবসাথী প্রকল্পের স্ট্যাটাস কীভাবে চেক করবেন?
আবেদন জমা দেওয়ার পর স্ট্যাটাস চেক করতে অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে লগইন করুন। অ্যাপ্লিকেশন নম্বর বা মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে স্ট্যাটাস দেখুন। এছাড়া, হেল্পলাইন নম্বর বা ক্যাম্পে যোগাযোগ করতে পারেন। যদি কোনো সমস্যা হয়, তাহলে দ্রুত সংশোধন করুন। প্রকল্পের আপডেটের জন্য সরকারি ওয়েবসাইট বা অ্যাপ চেক করুন।
যুবসাথী প্রকল্পের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য সরকারি উদ্যোগ
Yuvasathi Scheme পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য যুবকল্যাণ কর্মসূচির সাথে যুক্ত। উদাহরণস্বরূপ, স্বামী বিবেকানন্দ স্কলারশিপ বা কন্যাশ্রী প্রকল্পের সাথে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। সরকারের দক্ষতা বিকাশ কর্মসূচি যেমন উৎকর্ষ বাংলা এর সাথে মিলিয়ে যুবকরা আরও লাভ নিতে পারেন। এছাড়া, কৃষক বন্ধু বা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো প্রকল্প থেকে আলাদা রাখা হয়েছে, যাতে ডুপ্লিকেট সুবিধা না হয়। এই প্রকল্পগুলো একসাথে যুবকদের সামগ্রিক উন্নয়ন করে।
প্রসঙ্গত, প্রকল্পটি যুবকদের আর্থিক স্বাধীনতা দেয় কিন্তু চাকরির স্থায়ী সমাধান নয়। কিছু সমালোচকের মতে এটি ভাতার মাধ্যমে যুবকদের নির্ভরশীল করে, কিন্তু সরকারের দাবি এটি অস্থায়ী সাহায্য। প্রথম দিনের আবেদনের সংখ্যা দেখে বোঝা যায় যে এটি যুবকদের মধ্যে ইতিমধ্যেই বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। তাই আসা করা হচ্ছে ভবিষ্যতে প্রকল্পে বরাদ্দ আরও বাড়ানো হতে পারে।
