দীর্ঘ দিনের বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে লোকসভায় পাশ হয়ে গেল ওয়াকফ সংশোধনী বিল। শাসক দলই শেষমেশ জয়ের হাসি হাসলো। বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন ২৮৮ জন সাংসদ এবং বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন মোট ২৩২ জন। তবে পরীক্ষা আসল ছিল বৃহস্পতিবার। অবশেষে লোকসভার পর রাজ্যসভাতেও 128 বনাম 95 ভোটে পাশ হয়ে গিয়েছে ওয়াকফ সংশোধনী বিল। তবে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যে বিরোধী দল ঠিক কী কারণে এই বিল থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে ? কেনই বা এত বিতর্ক তৈরি হচ্ছে এই বিল নিয়ে?
সরকারের তরফে ওয়াকফ আইনে সংশোধনের কারণ ওয়াকফ বোর্ডের কাঠামো এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ওয়াকফ সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ তারা নিজের হাতে চাইছে। এই সংশোধনী প্রস্তাবের মধ্যে থাকা ৪০ নম্বর ধারাকে কার্যত ধুয়ে মুছে সাফ করতে মরিয়া বিজেপি। এমনকি, বুধবার লোকসভায় যে আলোচনা হয়েছিল তাতেও বারংবার ওয়াকফ আইনের এই ৪০ নং ধারার কথা সামনে আসছিল। তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর তরফে আবার মন্তব্য করা হয়েছিল, “যদি ৪০ নং ধারা বাদ করতে হয় সেক্ষেত্রে ওয়াকফ বোর্ড দাঁতহীন পুতুল হয়ে যাবে। এই ধারা না থাকলে ওয়াকফ বোর্ডের কোনও প্রয়োজনই থাকবে না।”
আরও পড়ুন: Waqf: এত বিতর্ক কেন ওয়াকফ বিল নিয়ে? প্রস্তাবিত সংশোধনী বিলে কী রয়েছে? জেনে নিন সবটা
এই সংশোধনী প্রস্তাবের 40 নম্বর ধারায় এমন কীসের উল্লেখ রয়েছে যা বাড়তি বিতর্ক সৃষ্টি করছে? ওয়াকফ সম্পত্তি নির্ধারণের ক্ষমতা সংক্রান্ত বিষয়ে ওয়াকফ আইনের ৪০ নং ধারায় আলোচনা করা হয়েছে। কোনও সম্পত্তি বা জমি ওয়াকফ দখল করলে তা তাদের কিনা তা ঠিক করার যাবতীয় ক্ষমতা আইনের এই ধারায় আছে। এতে সরকার কোনও রকম পর্যালোচনার সুযোগ পায় না। কোনও জমি বা সম্পত্তি ওয়াকফের অধীনে কিনা তা ওয়াকফ বোর্ডই একমাত্র সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এই ধারায় সাব সেকশন ১-এ উল্লেখ রয়েছে, যদি কোনও সম্পত্তি ওয়াকফের বলে মনে হয়, তবে ওয়াকফ বোর্ড নিজে সেই সম্পত্তি সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করতে পারে। সেক্ষেত্রে বোর্ডের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে গৃহীত হবে।
৪০(২) ধারায় ওয়াকফ বোর্ডকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। এই ধারায় উল্লেখিত রয়েছে, কোনও সম্পত্তি নিয়ে বোর্ডের সিদ্ধান্তই শেষ কথা বলবে, যদি না তা ওয়াকফ ট্রাইবুনাল প্রত্যাহার বা পরিবর্তিত করে। এতে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকার কোনও হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। কোনও জমিকে ওয়াকফের বলে দাবি করা হলে সেক্ষেত্রে রাজ্য বা কেন্দ্র তা কাঠগড়ায় তুলতে পারবে না।
৪০(১)(৩) ধারায় বলা হয়েছে, যে সম্পত্তির ওপর ওয়াকফের অধিকার নেই তা কোনও ট্রাস্ট বা সোসাইটির নামে থাকলে সেক্ষেত্রে কী হবে। এই ধারায় উল্লেখ রয়েছে, যদি ওয়াকফ বোর্ডের সরকারি রেজিস্টার্ড অন্য কোনও সোসাইটি বা ট্রাস্টের জমি ওয়াকফের জমি বলে মনে হয়, তবে বোর্ড এই সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে খতিয়ে দেখতে পারে। তারপর যদি তা ওয়াকফ সম্পত্তি বলে প্রমাণিত হয়, তবে ওই ট্রাস্ট বা সোসাইটিকে উল্লেখিত সম্পত্তি ওয়াকফে রেজিস্টার করতে বলতে পারে বা কেন তা ওয়াকফে রেজিস্টার হবে না, তার কারণ দেখাতে বলতে পারে।
৪০(১)(৪) ধারায় বলা হয়েছে, ওয়াকফ বোর্ডের সিদ্ধান্তই যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, তাকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। ওয়াকফ ট্রাইবুনাল ছাড়া অন্য কেউ এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগ পাবে না। এবার নয়া এই সংশোধনী বিলে ওয়াকফ আইনের এই ৪০ ধারা টিকেই বিলুপ্ত করা হয়েছে। এবার থেকে ওয়াকফের সম্পত্তি বা জমি সংক্রান্ত বিষয়ে কেন্দ্র তা চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। এবং যেকোনো সম্পত্তি বা জমি নিজের বলে দাবি করতে পারবে না ওয়াকফ।
ওয়াকফ সংশোধনী বিলে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যে জেলা কালেকটরের অফিসে ওয়াকফ সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন করা আবশ্যক।আইন চালু হওয়ার আগে বা পরে যদি কোনও সরকারি সম্পত্তি ‘ওয়াকফ সম্পত্তি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে, সংশোধনী পাশ হওয়ার পর তা ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে না। তা আদেও ওয়াকফ সম্পত্তি নাকি সরকারি জমি জেলা তা ঠিক করতে পারবে কালেকটর।
এক্ষেত্রে তার কথাই হবে শেষ কথা। রাজ্য সরকারের কাছে রিপোর্ট না পেশ করলে তা ওয়াকফ সম্পত্তি বলে তা গন্য হবে না। হাইকোর্টে আবেদন করা যেতে পারে ওয়াকফ বোর্ডের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনও বিতর্ক থাকলে।এতদিন মৌখিকভাবে ওয়াকফ সম্পত্তি চিহ্নিত করা যেত কোনও নথির সাহায্য ছাড়াই। সংশোধনী বিল পাশ হওয়ার পর নথি না থাকলে সেই জমি বিতর্কিত বলেই গণ্য করা হবে।